ছাক্কি পাগলী

 


ছাক্কি পাগলী

পূর্বে নন্নী বাজার, পশ্চিমে বাইগর পাড়া, মাঝখনে তারাপড়া বিল। বিলের চারপাশে  বিশ পচিঁশ একর জমি। মালিক গয়া ছমির মন্ডল। ছেলে দুইজন। আলী আকবর আর আলী আজগর। দুজনেই চেহারা ছবি মাশাল্লা। নাম ডাক প্রচুর। সম্পদের ওয়ারিশ শুধুই দুই ভাই।দুইভায়ের মধ্যে বড়টা একটু বোকাসোকা ভাব, আর ছোট টা, তার চাল-চলন দেখে মনে হয় নবাব সিরাজদৌলার বংশধর। সাদা জামা আর হাতি মার্কা লুঙ্গি পরে হাতে বাশি নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন বনে বাদারে। বাশি বাজাতেন মধুর সুরে। দু চোখে সুরমা দিয়ে পাড়া চষে বেড়াতেন, আর পাখি খুজঁতেন। একমাত্র নেশা ছিল পাখি খুজাঁ। ডাগর ডাগর চোখ, মেঘ কালো কেশ, আর মায়াবী চাহনির পাখিদের বশ করা তার কাছে কোন ব্যাপার ছিল না।

জীবনে অনেক সুন্দর সুন্দর পাখিদের বশ করেছেন আবার বিয়ে করতেও আলসেমি করেনি। আজ এ গাঁ তো কাল ও গাঁ, খালি হাতে ফিরতেন না তিনি, পাখি ছাড়া। রক্তের সাথে মিশে গিয়েছিল পাখির অস্তিত্ব। সুতরাং পাখি বাড়ছে আর ও দিকে সম্পদ কমছে।

বড় ভাই আলী আকবর। উনি সাধারন জীবন যাপন করেন। সংসারের বড় ছেলে হিসাবে সকল কাজ তাকেই সামলে নিতে হয়। তিনিও খুব সুন্দর চেহারার অধিকারী । যেহেতু একই বাপের ক্রোমোজোম দিয়ে গঠিত দুই ভাই, সেহেতু মেন্টালী প্রিপারেশান কিছুটা হলেও ভায়ের টা পাবেই। ব্যাপার না, হয়েছেও তাই। তবে ছোট ভায়ের মত বিড়ালের মত ছোক ছোক করা স্বভাব তার ছিলনা। তার চলা ফেরায় একটা ভাব আছে।

 

বড় ভাই আলী আকবরের চলাফেরায় ছিল এক ধরনের গাম্ভীর্য। গ্রামের মানুষ তাকে সম্মান করত। জমির হিসাব-নিকাশ, ধান কাটা, শ্রমিকের মজুরিসবকিছুই তার হাত দিয়েই চলত। ছোট ভাই আজগর যখন বাঁশি হাতে বিলের পাড়ে পাখির খোঁজে ঘুরে বেড়াত, তখন আকবর মাথায় গামছা বেঁধে রোদে-জলে মাঠে পড়ে থাকত।

একদিন সকালে তারাপড়া বিলে ধান দেখতে গিয়ে আকবরের চোখে পড়ল এক অদ্ভুত দৃশ্য। বিলের ধারে কাশফুলের আড়ালে বসে আছে এক তরুণী। এলোমেলো চুল, পরনে পুরনো নীল শাড়ি, হাতে শাপলার মালা। কখনো আপন মনে হাসছে, আবার কখনো বিলের পানির সঙ্গে কথা বলছে।

গ্রামের মানুষ তাকে ডাকত "ছাক্কি পাগলী"

কেউ বলত, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মেয়েটার মাথা নষ্ট হয়েছে। কেউ বলত, জ্বিনে ধরেছে। আবার কেউ ফিসফিস করে বলত, পূর্ণিমার রাতে নাকি তাকে বিলের মাঝখানে হাঁটতে দেখা যায়। সত্যিটা কেউ জানত না।

আকবর দূর থেকে দেখেই ফিরে এল। মানুষের কষ্ট নিয়ে হাসাহাসি করা তার স্বভাবে ছিল না। কিন্তু আজগরের কানে খবর যেতেই সে যেন নতুন এক পাখির সন্ধান পেল।

পরদিন ভোরে সাদা জামা, হাতি মার্কা লুঙ্গি পরে, চোখে গাঢ় সুরমা টেনে, হাতে প্রিয় বাঁশি নিয়ে সে হাজির হলো তারাপড়া বিলে। ধীরে ধীরে বাঁশিতে সুর তুলতেই বিলের বাতাস যেন থমকে গেল। বকের দল উড়ে এসে কাশবনে বসে রইল, শালিকেরা ডালে ডালে চুপ হয়ে গেল।

ছাক্কি পাগলীও মুখ তুলে তাকাল।

কয়েক মুহূর্ত সে স্থির চোখে আকবরের  দিকে চেয়ে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল,

— "তুমি পাখি ধরতে এসেছ, না নিজের মনটাকেই হারাতে এসেছ?"

আকবরের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। জীবনে বহু মেয়ের চোখে সে মুগ্ধতা দেখেছে, কিন্তু এমন প্রশ্ন কেউ কখনো করেনি।

সেদিন সে কোনো উত্তর দিতে পারল না।

বাঁশির সুর থেমে গেল। বিলের বাতাস আবার আগের মতো বইতে শুরু করল। কিন্তু আকবরের  মনে হলো, এতদিন সে যাদের পাখি ভেবে খুঁজে বেড়িয়েছে, তারা কেউই আসল পাখি ছিল না। তারাপড়া বিলের কাশবনের আড়ালে বসে থাকা এই রহস্যময় মেয়েটিই যেন তার জীবনের সবচেয়ে দুর্লভ পাখি।

সেদিন থেকেই শুরু হলো এক অদ্ভুত গল্পযেখানে গ্রামের লোকেরা যাকে পাগলী বলে এড়িয়ে চলত, তার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এমন এক রহস্য, যা বদলে দিতে চলেছিল আলী আকবর, আলী আজগর এবং ছমির মণ্ডলের পুরো পরিবারের ভাগ্য। ( চলবে ).....................................


Post a Comment

0 Comments